এক রাতে অন্ধ্রপ্রদেশে ৭০ লক্ষ্য ভোটার বাদ

অন্ধ্রপ্রদেশে আনুমানিক ১৭ লক্ষ ভোট মধ্যরাতে! দাবি পরকাল প্রভাকরের!

২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনোত্তর পর্বে ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর স্বচ্ছতা নিয়ে দেশজুড়ে এক প্রবল বিতর্কের ঝড় উঠেছে। 
Facebook  | Instagram | YouTube | 

এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. পরকাল প্রভাকর, যিনি দেশের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের স্বামী হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে একের পর এক বিস্ফোরক দাবি করে চলেছেন।

সম্প্রতি দিল্লিতে আয়োজিত এক প্রেস কনফারেন্সে তিনি অন্ধ্রপ্রদেশ এবং বিহারের নির্বাচন সংক্রান্ত যে গাণিতিক ও পরিসংখ্যানগত তথ্য তুলে ধরেছেন, তা তথাকথিত 'গণতান্ত্রিক জয়'-এর পর্দার আড়ালে এক রহস্যময় অন্ধকারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

তাঁর এই তথ্যগুলি কেবল অভিযোগ নয়, বরং সরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা কিছু অসম্ভব অসামঞ্জস্যের দিকে আঙুল তুলছে, যা কোনো সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়।

অন্ধ্রপ্রদেশের ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ড. প্রভাকর যে 'মধ্যরাতের ভোট' তত্ত্ব সামনে এনেছেন, তা আক্ষরিক অর্থেই চমকে দেওয়ার মতো। 

তাঁর দাবি অনুযায়ী, ১৩ মে ২০২৪ তারিখে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ধ্যাবেলায় শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, নথিপত্র বলছে কয়েক হাজার বুথে রাত ২টো পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলেছে। 

নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটদানের হার ছিল ৬৮.০৪ শতাংশ। রাত ৮ টার সময় সেই সংখ্যাটি সামান্য বেড়ে ৬৮.১২ শতাংশে পৌঁছায়। 

কিন্তু রাত ১১:৪৫ মিনিটে এক অভাবনীয় লম্ফ লক্ষ্য করা যায়, যেখানে ভোটদানের হার একধাক্কায় বেড়ে দাঁড়ায় ৭৬.৫০ শতাংশ। 

চূড়ান্ত পরিসংখ্যানে এই হার ছিল ৮১.৭৯ শতাংশ। 

প্রভাকর গাণিতিক হিসাব কষে দেখিয়েছেন যে, রাত ১১:৪৫ থেকে রাত ২ টোর মধ্যে অর্থাৎ মাত্র সোয়া দু-ঘণ্টায় অন্ধ্রপ্রদেশে প্রায় ১৭ লক্ষ ভোট পড়েছে। 

সম্পূর্ণ সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত ধরলে এই সংখ্যাটি প্রায় ৫২ লক্ষে গিয়ে পৌঁছায়। 

একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন এই প্রক্রিয়ার গতি নিয়ে। তাঁর মতে, গভীর রাতে যখন মানুষের উপস্থিতি সবচেয়ে কম থাকার কথা, তখন গড়ে প্রতি ২০ সেকেন্ডে একটি করে ভোট পড়েছে। 

এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাত্র ৬ সেকেন্ডে একটি ভোট সম্পন্ন হয়েছে বলে রেকর্ডে দেখা যাচ্ছে। 

বিজ্ঞানসম্মতভাবে একটি ইভিএম (EVM) মেশিনে ভোট দেওয়ার পর সেটি পুনরায় প্রস্তুত বা 'রিসেট' হতে অন্তত ১২ থেকে ১৪ সেকেন্ড সময় নেয়। সেক্ষেত্রে ৬ বা ১০ সেকেন্ডে কীভাবে একজন ভোটার বুথে প্রবেশ করে, নিজের পছন্দমতো বোতাম টিপে এবং ভিভিপ্যাট (VVPAT) স্লিপ দেখে বেরিয়ে আসতে পারেন, তা এক বিরাট রহস্য। 

এই 'অতিপ্রাকৃত' গতিতে ভোট পড়া কেবল তখনই সম্ভব যদি বুথের ভেতর কোনো যান্ত্রিক কারসাজি বা 'বক্স স্টাফিং'-এর মতো ঘটনা ঘটে থাকে।

অন্ধ্রপ্রদেশের এই ভৌতিক ভোটের গল্পের সমান্তরালে ড. প্রভাকর বিহারের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার এক ভয়ংকর দিক তুলে ধরেছেন।

বিহারের ক্ষেত্রে তাঁর মূল অভিযোগ ভোটার তালিকার 'শুদ্ধিকরণ' বা 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (SIR) নিয়ে। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, বিহারে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে প্রায় ৬৫ থেকে ৮০ লক্ষ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। 

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৬০ লক্ষই ছিলেন মহিলা ভোটার। ড. প্রভাকরের মতে, এটি কোনো সাধারণ যান্ত্রিক ত্রুটি বা ভোটারদের স্থানান্তরের ফল নয়, বরং এটি একটি 'ডিজিটাল জালিয়াতি'। 

তিনি দাবি করেছেন যে, যে সমস্ত গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মানুষ বর্তমান শাসক দলের বিরোধী হিসেবে পরিচিত—বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং প্রান্তিক গোষ্ঠী—তাদের নাম বেছে বেছে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। 

তিনি এই প্রক্রিয়াকে 'শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক গণহত্যা' (Peaceful Political Genocide) হিসেবে বর্ণনা করেছেন, কারণ শারীরিক হিংসা ছাড়াই লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে নির্বাচনের ফলাফলকে আগেভাগেই প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। 

বিহারের মতো রাজ্যে যেখানে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়ছে, সেখানে এত বিপুল সংখ্যক মহিলার নাম বাদ পড়া সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে এক গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়। যে খেলাটা এখন পশ্চিমবঙ্গে চলছে। ঠিক একই কায়দায় এখানেও লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে ক্ষমতা দখলের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র চলছে। রাহুল গান্ধী ইতিমধ্যে একাধিক রাজ্যে ভোট চুরির অভিযোগ জানিয়ে প্রমাণসহ সাংবাদিক সম্মেলন করবেন।

এই সমগ্র বিতর্কে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও ড. প্রভাকর কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তিনি এবং তাঁর সাথে থাকা অন্য বিশেষজ্ঞ যেমন যোগেন্দ্র যাদব ও প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার এস.ওয়াই. কুরাইশি প্রশ্ন তুলেছেন 'ফর্ম ১৭-সি' (Form 17C) নিয়ে। 

নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি বুথে কত ভোট পড়ল তার হিসাব এই ফর্মে থাকে এবং এটি তৎক্ষণাৎ প্রকাশ করার কথা। কিন্তু কমিশন কেন এই তথ্য প্রকাশ করতে দীর্ঘ সময় নিয়েছে এবং কেন চূড়ান্ত ভোটার সংখ্যার সাথে প্রাথমিক সংখ্যার এত বড় ফারাক (সারা দেশে প্রায় ৫ কোটি ভোট) তৈরি হলো, তার কোনো সদুত্তর মেলেনি। 

ড. প্রভাকরের মতে, স্বচ্ছতার অভাবই হলো কারচুপির প্রথম লক্ষণ। যখন তথ্যের ডিজিটাল রূপান্তর ঘটে, তখন যদি মেশিন রিডেবল ফরম্যাটে বা বুথভিত্তিক হিসাব সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রাখা হয়, তবে বুঝতে হবে গণতন্ত্রের পর্দার আড়ালে অন্য কিছু ঘটছে। 

তাঁর এই অনুসন্ধানী বয়ান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নির্বাচনে এনডিএ জোটের যে অভাবনীয় ফলাফল দেখা গেছে, বিশেষ করে অন্ধ্রপ্রদেশের ১৬৪ টি আসনে জয়, তা কেবল জনসমর্থন নয় বরং পরিসংখ্যানের গোলকধাঁধায় তৈরি এক সাজানো চিত্র হতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, পরকাল প্রভাকরের এই দাবিগুলি ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থাকে এক বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তিনি কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতার খাতিরে কথা বলছেন না, বরং একজন সংখ্যাতত্ত্ববিদ ও অর্থনীতিবিদ হিসেবে তিনি তথ্যের অসংগতি ধরিয়ে দিচ্ছেন। 

যদি মধ্যরাতে কয়েক লক্ষ ভোটার অদৃশ্য জাদুবলে বুথে এসে ৬ সেকেন্ডে ভোট দিয়ে যান, কিংবা যদি লক্ষ লক্ষ মহিলার নাম রাতারাতি তালিকা থেকে ভ্যানিশ হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে ভারতের গণতন্ত্র আজ লাইফ সাপোর্টে রয়েছে এবং বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার কি তাহলে মানুষের রায়তে নয়, এক প্রকার জোর করেই সরকারে বসে আছে?

বিহারের ভোটার তালিকা থেকে মানুষের নাম কাটা আর অন্ধ্রপ্রদেশের ইভিএম-এ রাতারাতি ভোটের পাহাড় তৈরি হওয়া—এই দুটি ঘটনা আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। 

ড. প্রভাকরের এই সতর্কতা যদি সত্যিই অমূলক না হয়, তবে আগামী দিনে ভারতের সাধারণ মানুষের ভোটের দাম কেবল একটি কাগজের টুকরো বা বোতাম টেপার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে, যেখানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে জনগণের আঙুলের ডগায় নয়, বরং কম্পিউটারের অ্যালগরিদমে বা মহা মানবদের ইশারায়। 

তাঁর এই লড়াই তাই কেবল একটি দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা রক্ষার এক চূড়ান্ত মরণপণ লড়াই।

Comments

Popular posts from this blog

মাসাবুদ্দিনের রক্তে প্রাণ ফিরে পেলেন মাধবী দেবী: পলাশীর মাটিতে মানবতার অমর গল্প EBS 🩸

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের জেরে এসআইআর শুনানির সময়সীমা বৃদ্ধির ভাবনা কমিশনের, পিছিয়ে যেতে পারে চূড়ান্ত তালিকাপ্রকাশ

নিপাহ ভাইরাস কী ? একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি