এক হার না মানা স্বপ্নের গল্প: মঙ্গলা কাপুরের অসাধারণ যাত্রা – অ্যাসিডের আগুন থেকে পদ্মশ্রীর আলোয়
জীবনের কোনো একটা মুহূর্তে যদি সবকিছু তছনছ হয়ে যায়, তাহলে কী হয়? অনেকে হার মানেন, কেউ কেউ লড়াই চালিয়ে যান। আর কিছু মানুষ এমনভাবে উঠে দাঁড়ান যে তাঁদের গল্প সারা দেশকে অনুপ্রাণিত করে। মঙ্গলা কাপুর তেমনই একজন। মাত্র ১১-১২ বছর বয়সে অ্যাসিড অ্যাটাকের শিকার হয়ে তাঁর জীবন যখন অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল, তখনও তিনি হার মানেননি। আজ তিনি ভারতের পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত, কাশীর লতা নামে পরিচিত, এবং ধ্রুপদী সঙ্গীত ও শিক্ষার জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
১৯৬৫ সালের এক রাতে, ব্যবসায়িক বিবাদের কারণে এক নির্মম অ্যাসিড হামলা হয় মঙ্গলা কাপুরের উপর। তাঁর বয়স তখন মাত্র ১১-১২ বছর। অ্যাসিডের আগুন তাঁর মুখ, শরীর আর স্বপ্নকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। হাসপাতালের চার দেওয়ালের মধ্যে কাটাতে হয় বছরের পর বছর। দীর্ঘ ৬ বছর ধরে তিনি সহ্য করেন ৩৬-৩৭টি সার্জারির অসহ্য যন্ত্রণা। মানসিক হতাশা, সমাজের অবহেলা, আয়নার সামনে দাঁড়ানোর ভয়—সবকিছু তাঁকে ঘিরে ধরেছিল। কিন্তু তাঁর বাবা ছিলেন সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি কখনো ছেড়ে যাননি। তাঁর সাপোর্টে মঙ্গলা ধীরে ধীরে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসেন।
অন্ধকারের মধ্যে তিনি খুঁজে পান এক আলো—সঙ্গীত। ধ্রুপদী সঙ্গীত তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে ওঠে। যে যন্ত্রণা শরীরে ছিল, সেই যন্ত্রণাকে তিনি সুরে রূপান্তরিত করেন। গোয়ালিয়র ঘরানার ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। তিনি ভর্তি হন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে (BHU)। সেখান থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং সঙ্গীতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। যে শরীরকে সমাজ অসুন্দর বলে মনে করত, সেই শরীরের ভিতর থেকে উঠে আসা সুর সকলকে মুগ্ধ করতে শুরু করে।
১৯৮৯ সালে তিনি BHU-এর সঙ্গীত বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন। তিন দশক ধরে তিনি অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীকে শিখিয়েছেন। শুধু সঙ্গীত শেখানো নয়, তিনি সঙ্গীতকে ব্যবহার করেছেন সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে। তাঁর শিক্ষাদানের মাধ্যমে ছাত্ররা শিখেছে যে যন্ত্রণা থেকেও সৃষ্টি সম্ভব, হার না মানলে জীবন জয় করা যায়। তাঁর অবদানের জন্য তরঙ্গ প্রতিষ্ঠান তাঁকে "কাশী কি লতা" উপাধিতে ভূষিত করে। এই উপাধি তাঁর জীবনের প্রতিফলন—কাশীর মতো প্রাচীন শহরে যেমন লতা লতিয়ে বেড়ে ওঠে, তেমনই তিনি যন্ত্রণার মাঝে বেড়ে উঠেছেন।
BHU की एसिड अटैक सर्वाइवर प्रोफेसर ...
আর এই অসাধারণ যাত্রার স্বীকৃতি এল ২০২৬ সালে। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ২০২৬ সালের পদ্ম পুরস্কারের তালিকা প্রকাশ করে। এই তালিকায় সাহিত্য ও শিক্ষায় অবদানের জন্য পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন মঙ্গলা কাপুর। ১৩১ জন পদ্ম পুরস্কারপ্রাপ্তের মধ্যে তাঁর নাম উঠে আসে উত্তরপ্রদেশ থেকে। এই সম্মান শুধু তাঁর সঙ্গীত ও শিক্ষার জন্য নয়, বরং তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তির জন্য। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ অনেকে তাঁকে অভিনন্দন জানান। মঙ্গলা কাপুর নিজে বলেছেন, এই খবর শুনে প্রথমে বিশ্বাস হয়নি—কিন্তু এটি তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
মঙ্গলা কাপুরের গল্প শুধু একজন অ্যাসিড অ্যাটাক সারভাইভারের গল্প নয়—এটি প্রত্যেকের জন্য অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে যন্ত্রণা যতই গভীর হোক, স্বপ্ন যদি থাকে তাহলে তা ভাঙা যায় না। সঙ্গীতের সুরে তিনি নিজেকে পুনর্গঠন করেছেন, ছাত্রদের জীবন গড়েছেন, এবং সমাজকে দেখিয়েছেন যে সত্যিকারের সৌন্দর্য বাইরে নয়, ভিতরে। আজ যখন অ্যাসিড অ্যাটাকের মতো ঘটনা এখনও ঘটছে, মঙ্গলা কাপুরের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বেঁচে থাকা শুধু শ্বাস নেওয়া নয়—লড়াই করা, সৃষ্টি করা এবং অন্যদের আলো দেখানো।
তাঁর যাত্রা থেকে আমরা শিখি: হার মানলে শেষ, কিন্তু লড়াই করলে নতুন শুরু। কুর্নিশ রইলো এই অসাধারণ নারীকে। মঙ্গলা কাপুরের মতো মানুষেরা আমাদের দেশের গর্ব।
জয় হোক অদম্য ইচ্ছাশক্তির! ✌️🇮🇳
Comments
Post a Comment